Main Menu

গ্যাস সিলিন্ডার নাকি মৃত্যুফাঁদ!

গ্যাস সংকট নিত্য সমস্যা হওয়ায় রান্নার ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে রাজধানীতে বাড়ছে তরল পেট্রলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার। সরকারি নিয়মনীতি না মেনে যত্রতত্র খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার। আর এ সুযোগে বাজারে সরবরাহ বেড়েছে মানহীন এলপিজি সিলিন্ডার। বিস্ফোরক পরিদফতরের লাইসেন্স ছাড়াই এলপিজি সিলিন্ডার মিলছে চায়ের দোকানেও। মানহীনতার কারণে এসব গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে বেড়েই চলছে হতাহতসহ দুর্ঘটনা। যেন এটি মৃত্যুফাঁদ। তবুও এসব দেখার যেন কেউ নেই। কর্মকর্তারা বলছেন জনবল সংকটের কারণে সঠিক তদারকি হচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ এক আতঙ্কের নাম গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। যাতে হতাহত হচ্ছে বহু মানুষ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা বলছেন, এমন দুর্ঘটনার শিকার বেশিরভাগ রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। আর ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও মারাত্মক ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয় জীবনভর।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী শাহিন ইসলাম জানান, ‘রেগুলেটর খোলা ছিল, তখন আমি ম্যাচ মারার সঙ্গে সঙ্গে গায়ে আগুন ধরে গেছে’ এ দুর্ঘটনায় শরীরের প্রায় ৩০ শতাংশ পুড়ে গেছে। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে ফিরতে পারলেও এমন সৌভাগ্য অনেকেরই হয় না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ডা. তানজির আহমেদ বলেন, শরীর পুড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেটা হয়, তার শ্বাসনালী থেকে ফুসফুস পর্যন্ত ভিতরে যে ঝিল্লিটা পুড়ে যায়। এই পুড়ে যাওয়াটা সব থেকে বিপজ্জনক।
তিনি বলেন, এ দুর্ঘটনাগুলো ঘটার পরে ডাক্তারদের কিছু করার থাকে না। কিন্তু যাতে না ঘটে সে জন্যই এখন কাজ করা উচিত।

জানা গেছে, সারাদেশে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করার অনুমোদন রয়েছে ৫৫টি কোম্পানির। এর মধ্যে ১৫টির মতো প্রতিষ্ঠান এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করছে। বসুন্ধরা, ওমেরাসহ কয়েকটি কোম্পানি নিজেরাই সিলিন্ডার তৈরি করে। শুধু ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এলপিজি সিলিন্ডার আমদানি হয়েছে ৩৯ লাখ ৬৪ হাজার ৭২৮টি। আর দেশে তৈরি হয়েছে ১১ লাখ চার হাজার ৩৩৫ সিলিন্ডার। গত পাঁচ বছরে বোতলজাতকরণ হয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ সিলিন্ডার। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসব সিলিন্ডার অনুমোদন ও ব্যবহার বিধি প্রচার করে বিস্ফোরক পরিদফতর।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, দেশে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বাজারজাত ও সরবরাহের প্রাথমিক অনুমতি পেয়েছে ৫৫টি কোম্পানি। কিন্তু মাত্র পাঁচটি কোম্পানি চ‚ড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। আর ১১টি কোম্পানি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ছাড়াই ব্যবসা করছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, হাতে গোনা দু-একটি স্বনামধন্য ব্র্যান্ডের এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার কোম্পানির সেবায় গ্রাহক সন্তুষ্ট থাকলেও ইতিমধ্যে বাজারে ঢুকে পড়ছে অখ্যাত বেশ কিছু কোম্পানি, যারা কোনো ধরনের মান রক্ষা না করেই নিম্নমানের গ্যাস সিলিন্ডার বাজারজাত করছে। এতে একদিকে গ্রাহক যেমন ঠকছেন, তেমনি বাড়ছে ভোগান্তি। আশঙ্কার বিষয়, সম্প্রতি আবাসিকে ব্যবহৃত এমন কয়েকটি নিম্নমানের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত ও গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের রেললাইন সংলগ্ন সুমনের চায়ের দোকান। অন্যান্য পণ্যের বেচাকেনার পাশাপাশি বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে এলপিজি সিলিন্ডার। শুধু তাই নয়, হার্ডওয়্যারের দোকান, ভাঙ্গাড়ির দোকানেও অবাধে মিলছে এসব গ্যাস সিলিন্ডার। তবে এসব দোকানে নেই আগুন নির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা। নিয়ম অনুযায়ী এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির জন্য বিস্ফোরক পরিদফতরের লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক হলেও এর তোয়াক্কা করেছেন না দোকানিরা। সনদের বিষয়েও ধারণা নেই তাদের। আর এ সুযোগেই অসাধু ব্যবসায়ীরা নিম্নমানের গ্যাস সিলিন্ডার বাজারজাত করছেন। যার ফলে হর-হামেশাই ঘটছে দুর্ঘটনা।

জানা গেছে, গ্যাস সিলিন্ডার থেকে সৃষ্ট দুর্ঘটনার কারিগরি তদন্ত করার পাশাপাশি এই সিলিন্ডার বোতলগুলো পরীক্ষা করার কথা সরকারের বিস্ফোরক অধিদফতরের। প্রতি পাঁচ বছর পর পর দায়িত্বপ্রাপ্ত এ সংস্থার সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা করার কথা। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরেই পুরনো সিলিন্ডারগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই। যদিও এর মধ্যে কিছু সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। কিন্তু বিস্ফোরক অধিদফতরের জনবল স্বল্পতায় এ কাজ করা বেশ কঠিন বলেও জানায় তারা।

বিস্ফোরক অধিদফতরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. সামসুল আলম বলেন, সিলিন্ডারগুলো বিস্ফোরক বিভাগ থেকে পাঁচ বছর পর পরীক্ষা করার কথা থাকলেও তা করা সম্ভব হচ্ছে না, যা সিলিন্ডার বিস্ফোরণের অন্যতম কারণ। ঝুঁকিপূর্ণ এ জ্বালানির অবৈধ বিক্রির কথাও স্বীকার করছেন তদারকি সংস্থা বিস্ফোরক পরিদফতর। জনবল কম আর প্রশাসনিক ক্ষমতা না থাকায় সফলতা মিলছে না বলেও জানান তারা।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে গ্যাস অগ্নিকাণ্ড হয়েছে ১৫৬টি। এর মধ্যে রাজধানীতে ৩৭টি আর বাইরে ঘটেছে ১১৯টি। এসবের মধ্যে গ্যাস লাইনে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে ৭৬টি আর সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৮০টি। এতে আহত হয় ৩৬ জন। তবে ২০১৬ সালে গ্যাস দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। এ বছর গ্যাস অগ্নিকাণ্ড ৪০টি বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৬-এ। এর মধ্যে রাজধানীতে দুর্ঘটনা ঘটে ৪০টি আর বাইরে ১৫৬টি। এসবের মধ্যে গ্যাস লাইনে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে ৬৫টি আর সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ১৩১টি। অগ্নিকাণ্ডে আহত হয়েছে ৪১ জন। আর মারা গেছে চারজন। এ ছাড়া ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত গ্যাস লাইনে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে ৫৮টি, সিলিন্ডারে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে ৭৯টি। এতে আটজন আহত হলেও মারা যান একজন।

অপরদিকে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের তথ্যে, ২০১৬-১৭ এই এক বছরে মোট চুলা থেকে সৃষ্ট কারণে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে ২৩৮টি। আর এ সময় গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটেছে পাঁচ হাজার ৬৫০টি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও অন্যান্য হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আসা রোগীর মধ্যে বেশিরভাগই রান্নার গ্যাসের অনিরাপদ ব্যবহারে পরবর্তী অসতর্কতার ফলে দুর্ঘটনার শিকার। প্রতিষ্ঠানটির জরিপ মতে, আক্রান্তদের মধ্যে বছরে কমপক্ষে ২ হাজার জনের মৃত্যু হয়। প্রাণে বেঁচে গেলেও কর্মক্ষমতা হারান অনেকে।

গ্যাস লিক হলে, উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তাই, এমন গন্ধ পাওয়া গেলে আগুন না জ্বালিয়ে বাসার বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করে দিতে হবে। সঙ্গে এসব বিষয়ে আরো সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিতাস কর্মকর্তারা।

তিতাস গ্যাসের পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান খান বলেন, চুলা জ্বালানোর আগে রান্না ঘরে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। চুলাটা ভালোভাবে নিভালো কি না, তা নিশ্চিত হয়ে চাবিটা বন্ধ রাখতে হবে। মূলত গ্রাহকরা এ সচেতনতা অবলম্বন করলে অনেকটা দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে নানা উদ্যোগ নেয়ার কথাও জানান এই কর্মকর্তা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। যে বাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার থাকে তার, বাড়িওয়ালার, গ্যাস কর্তৃপক্ষ, মিডিয়া, সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। আমরা সবাই যদি একসঙ্গে কাজ করি তাহলে এ দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। তা না হলে কিন্তু এ মৃত্যুর মিছিল বাড়তেই থাকবে।

(Visited 1 times, 1 visits today)





Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

− 6 = 1

Skip to toolbar