Main Menu

“নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে ওদের মানুষ করেছি, কিন্তু ঈদটা কাটলো বৃদ্ধাশ্রমেই”

দশমাস দশদিন পেটে ধরেছি। জীবনবাজি রেখে জন্ম দিয়েছি। সারাজীবন আগলে রেখেছি। নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে মানুষ করেছি। কি পেলাম? শুধু চেয়েছি জীবনের শেষ সময়টুকু যেনো সে আগলে রাখে, যেমনটা শৈশবে তাকে রেখেছিলাম…sc

কথাগুলো বলতে বলতে গলা ধরে এলো এক মায়ের। চোখের কোনে টলটল করছে জল। তিনি এখন রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বৃদ্ধাশ্রমে (প্রবীন হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান) বসবাস করছেন। সন্তান-সন্ততিরা খুব ব্যস্ত। বড় বড় চাকরি করেন। বড় বড় বাড়ি-গাড়ি, ঝি-চাকরেরও অভাব নেই। অভাব শুধু মায়ের থাকার জায়গার। তাই তাকে বৃদ্ধাশ্রমেই আশ্রয় নিতে হয়েছে।

বৃহস্পতিবার আর দশটা বাড়ির মতো স্বাভাবিক পরিবেশ দেখা যায় ওই বৃদ্ধাশ্রমে। মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উদযাপন উপলক্ষে ঈদের সাজে সেজেছেন সবাই। গোসল করে নতুন জামা কাপড় পরেছেন। সেমাই, ফিরনিও খেয়েছেন। দেখে বোঝার উপায় নেই তাদের ভেতরের হাহাকার।

আশ্রমে ঢুকে এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পর জানতে চাইলাম, ঈদ কেমন কাটছে? প্রশ্ন শোনে প্রথমে রেগেই গেলেন। ‘তোমাদের এক সমস্যা… কেমন আছি? এটা কি আমার বাড়ি? আমার বাবার বাড়ি? এখানে আমার কে থাকে যে, ঈদ করব? ওরা যেমন রাখে তেমন থাকি।’

কেমন আছেন- এমন প্রশ্ন বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের জন্য বিব্রতকরই বটে। এই একটি প্রশ্নই তাদের বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে দেয়। শত-সহস্র বেদনা ঝাঁপি খুলে বসে। চোখ জলে ভিজে ওঠার আগেই কোনোরকমে উত্তর দিয়ে পালিয়ে বাঁচতে চান অধিকাংশ আশ্রমবাসী। অনেকে নিজেদের দুঃখ-কষ্ট, বেদনা ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন কয়েকটি বাক্যে; কয়েকটি শব্দে।

ভদ্রমহিলার রাগ কমে গেলে ধীরে ধীরে বলেন- ‘জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করে একজন মা-বাবা তার সন্তানকে বড় করেন। সন্তানরা বড় হয়ে মা-বাবাকে ভুলে গেলে এ কষ্টের আর সীমা থাকে না। সন্তানরা যে যার মতো ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত। মাকে দেখার সময় হয় না তাদের। মাসে মাসে হোমের খরচ পাঠিয়ে দেয়। বছরে দু’একবার ইচ্ছে হলে দেখতে আসে। ঈদের জামা কাপড়ও কাজের লোকের মাধ্যমে পৌঁছে দেয় হোমে।’

তার মতই আরেক মা পথ চেয়ে বসে থাকেন। সন্তান-স্বজনদের জন্য অপেক্ষা করেন। কিন্তু কারো দেখা মেলে না। বৃদ্ধার কাছে জানতে চেয়েছিলাম- একসময় বাড়িতে সবার সঙ্গে ঈদ করতেন, এখন এখানে পরিবার পরিজন ছেড়ে ঈদ করছেন…। প্রশ্ন শেষ না হতেই তিনি বলে ওঠেন- ‘আমি তো ইচ্ছে করে এখানে থাকি না। আমার যাওয়ার জায়গা নেই। থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই এখানে থাকি। বেঁচে আছি যেহেতু খেতে হবে, থাকতে হবে তাই থাকি।’

আরেকজন বাবা ড. এমএ আওয়াল। একসময় পড়িয়েছেন দেশের অন্যতম এক বিদ্যাপীঠে। তিনিও হোমে থাকেন প্রায় বছরখানেক হলো। দুই ছেলে এক মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে ছিলো তার সুখের সংসার। কিন্তু এখন সবই স্বপ্নের মতো। ছেলেরা বড় হয়েছে। বড় চাকরি করছে। ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। তারাও বাবা-মা হয়েছেন। ঘরে মানুষ বেড়েছে। সঙ্গে তার থাকার জায়গাটিও হারিয়ে গেছে।

পুরনো স্মৃতি আউড়ে প্রবীণ এ শিক্ষক বলেন, ‘আমি নিজের হাতে তাদের মানুষ করেছি। ওদের মায়ের অসুস্থতার কারণে রান্না-বান্না, ছেলে-মেয়ের দেখাশোনা খুব একটা করতে পারতেন না। আমি প্রতিদিন রাত ৩টায় ওঠে তাদের জন্য রুটি বানিয়েছি। খাবার তৈরি করেছি। সে খাবার সকালে স্কুলে স্কুলে পাঠিয়েছি।’

কথা বলতে বলতে অশ্রুসজল চোখ মুছেন তিনি। তারপর আবার বলেন- ‘ঈদেও আমি নিজের হাতে সেমাই, ফিরনি, আইসক্রিম, চটপটি, ওরা যা খেতে পছন্দ করতো বা চাইতো তাই বানিয়ে দিতাম।’

এখানে ঈদ কেমন কাটে- প্রশ্ন করতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ড. আওয়াল। কোনো উত্তর দেন না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, ‘অনেক খাবার-দাবার দেয়া হয়েছে আমাদের। আমি নিজেও রান্না করেছি। খেয়েছি।’

ঈদে ঘুরতে যাবেন কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘১৯৮৬ সালে একটা দুর্ঘটনার পর ডান পায়ে সমস্যা হয়েছে। একারণে এখন খুব একটা বেরুতে পারি না। গত ঈদে এক ভাতিজার বাসায় গিয়েছিলাম। এর আগের ঈদে আরেক ভাইয়ের বাসায় গিয়েছিলাম। এ ঈদেও ভাতিজা যেতে বলেছে। দেখি যেতে পারি কিনা…’

(Visited 1 times, 1 visits today)





Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

+ 72 = 73

Skip to toolbar